স্বীয় প্রচেষ্টায় বেড়ে ওঠা এক শিক্ষক সুলতানা বেগম (৪৭)। তিনি মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ব্রাহ্মণগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। ১৯৯৫ সালে এসএসসি পাশ করার পরপরই পারিবারিক ভাবে বিবাহ বন্ধনে হউন। বিয়ের বছর দু’য়েক না যেতেই কন্যা সন্তানের জননী হউন। কিন্তু সব কিছুর পর তার মনে বিরাজ করে নিজের পায়ে দাড়ানোর বাসনা। তার অদম্য মনেবলের কাছে হার মানে সব প্রতিকুলতা। বিয়ের ৯ বছর পর ২০০৪ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে সুলতানা মনোবাসনা পুরণ করেন।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার হামরকোনা গ্রামের মোহাম্মদ উজির মিয়া ও করিমুননেছআ দম্পতির মেয়ে সুলতানা বেগম। তিনি বৈবাহিক সূত্রে হবিগঞ্জ শহরের চৌধুরীবাজার এলাকার বাসিন্দা হলেও কর্মস্থলের প্রয়োজনে বাবার বাড়িতে অবস্থান করছেন। আলাপচারিতায় তিনি জানান ব্রাহ্মণগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অভিভাবক ছাড়া একক প্রচেষ্টায় স্যারদের সাথে কথা বলে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হউন ১৯৮৫ সালে।
এরপর থেকে তাকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। সকালে গ্রামের মসজিদে আরবি পড়া শেষে বাড়িতে এসে ছোট ভাইদের গোসলসহ খাওয়ানোর কাজ সম্পন্ন করে তাদের স্কুলে যেতেন। গর্ভধারিণী করিমুননেছা পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াশুনা করলেও ছেলে-মেয়েদের পড়তে অনুপ্রেরণা কিংবা বাধা কোনটিই প্রদান করতে না। তার বাবা মৎস্য আড়তের মালিক ছিলেন তাই সব সময় ব্যবসায়িক কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন।
সুলতানা জানান মনেপ্রাণে বিশ্বাস ছিল যে কোন মূল্যে এসএসসি পাশ করতে হবে। একই সাথে ছোট তিন ভাই ছালিক, মানিক, মামুনকে এই ছোট বয়েসেই পড়ালেখার বিষয়ে উৎসাহ দিতে কার্পণ্য করতেন না। ঘর-গৃহস্থালীর কাজের পাশাপাশি একক চেষ্টায় পড়ালেখা করে ১৯৯৫ সালে এসএসসি পাশ করেন। এরপর ভর্তি হউন মৌলভীবাজার মহিলা কলেজে। এ অবস্থায় পারিবারিক আলোচনার ভিত্তিতে হবিগঞ্জ পৌর এলাকার চৌধুরীবাজারের মতিউর রহমানের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হউন। ভাটা পড়ে যায় পড়লেখায়। স্বামী প্রবাসী হওয়ায় অধিকাংশ সময় পিতার বাড়িতেই তিনি অবস্থান করতেন।
তবে তার স্বামী পড়ালেখা চালিয়ে যেতে কখনও অন্তরায় হয়ে দাড়াননি। এর মধ্যে সায়মা নামে এক সন্তানের জননী হউন। এমন পরিস্থিতিতে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি। কিন্তু চাকুরী করার অভিলাষ তার অন্তর থেকে মুছে যায়নি। বারবার চেষ্টার পর ২০০৩ সালে প্রাইমারি প্যানেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
২০০৪ সালে নিয়োগ পান। সেই থেকে তিনি সুনামের সাথে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জানান সাড়ে ২১ বছরের শিক্ষকতা জীবনের অধিকাংশ সময কাটছে নিজের শিক্ষা জীবন যে স্কুলে শুরু হয়েছিল সেখানে। নিজের গর্ভজাত একমাত্র সন্তান মাহবুবা রহমান সায়মা একই স্কুলে পড়ালেখা করে। বিএসএস (সম্মান) তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নকালে উচ্চ শিক্ষার লক্ষ্যে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছে।
শিক্ষক সুলতানা আরও জানান একনিষ্ঠ ভাবে পড়ালেখার চেষ্টা করেছি। অনুকুল পরিবেশের কারণে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারেনি। তবে কখনও ভেঙে পড়িনি। শ্রদ্ধা সাথে স্মরণ করেছেন তার শিক্ষক শিশির দত্ত, আব্দুস সোবহান, চিত্ত রঞ্জন চন্দসহ অনেকের কথা। একই সাথে স্মৃতিচারণ করেছেন সহপাঠী পারভীন সুলতানা, আয়েশা, রশিদা, তানিয়াসহ অনেকের। তিনি বলেন সব সময় চেষ্টা করেছি শত সীমাবদ্ধতার মধ্যে কিছু একটা করতে হবে।
মনের অজান্তে চিন্তা জগতে ঘুরপাক খেত যদি কখনও শিক্ষক হতে পারতাম। এ বাসনা যে সত্যি হবে কখনও ভাবিনি। ঐকান্তিক মনোবাসনা ফসল হিসেবে শিক্ষক হতে পেরেছি। তাই মেয়েকে তার ইচ্ছানুসারে বিদেশে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাঠাতে সক্ষম হয়েছি। তিনি বলেন যে মানুষটি কিছু একটা করার জন্য অনুপ্রেরণা দিতেন সেই জীবনসঙ্গী ২০১৪ সালে প্রয়াত হয়েছেন। তিনি মেয়ের সাফল্য গাঁথা দেখে যেতে পারলে কোন অনুশোচনা থাকত না জীবনে। এ কথার মধ্য দিয়ে অশ্রুজো চোখ মুছতে মুছতে জীবনের গল্প বলা শেষ করেন সুলতানা।
প্রধান সম্পাদক : নূরুল ইসলাম
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় :
আল-ফাহাদ কম্পিউটার ও গ্রাফিক্স ডিজাইন হাউস, আফরোজগঞ্জ-৩২০৩, শেরপুর, মৌলভীবাজার।
ফোন: +৮৮ ০১৭২৮-২৪২৭৮৮, ই-মেইল: creativenewsbd2019@gmail.com