গিন্নী বাপের বাড়িতে গেছে বোনদের সাথে ঈদুল আজহা উদযাপন করতে। ফলে বাড়ির সব কাজ নিজেকেই করতে হচ্ছে। আমি যেহেতু সর্ব হাটের কাঁঠালি কলা। জুতা সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সব কাজেরই কাজী তাই অসুবিধা কিছু হচ্ছে না। দেবী দশভুজার মেল ভার্সন হয়ে সব কাজই করে যাচ্ছি একা। কিন্তু সমস্যা একটা হচ্ছে তা হলো একটু বিশ্রামের কোন সুযোগ পাচ্ছি না। ঈদের তৃতীয় দিন। কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক বন্ধুবর বঙ্গ রাখালের ফোন, লাঙ্গলবাঁধ যেতে হবে রেডিও হন। ঘুরাঘুরি'র কথা উঠলে আমি তো পঙ্খীরাজ হয়ে উঠি! দ্রুত হাতের কাজ শেষ করে গুছিয়ে বের হয়ে পড়ি। সাধুহাটি বাজার থেকে বঙ্গ রাখাল যুক্ত হন। ব্যাটারি চালিত ভ্যান বাতাস কেটে এগিয়ে যাচ্ছে ঝড়ের গতিতে। গ্রামীণ সড়ক। রাস্তার দু-ধারে সবুজ বিটপী'র সারি। মাঠের পর মাঠ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে পাটক্ষেত যেন সবুজ আলোয়ান বিছিয়ে রেখেছে। স্নিগ্ধ বাতাসের ঝাপটায় শীতল হচ্ছে দেহ মন। বঙ্গ রাখাল বললেন গন্তব্য কবি, অনুবাদক ও গল্পকার মনোজিৎকুমার দাসের বাড়ি। মনোজিৎকুমার দাসের নামের সাথে পরিচিত হলেও দেখা হয়নি কখনও। আজ সুযোগ হলো হাতছাড়া কি করা যায়? চললাম। লাঙ্গলবাঁধ বাজারে নেমে বাড়ি অন্বেষণের পালা। খোঁজা হচ্ছে মালিথিয়া মনোজিৎকুমার দাসের বাড়ি। বহু খোঁজাখুঁজি'র পর যখন পেলাম তখন গিয়ে দেখি এ যে মালিথিয়া নয় মাশালিয়া। বঙ্গ রাখাল ভুল করেছিলো গ্রামের নাম। মুল রাস্তায় নামিয়ে দিলো ভ্যান চালক। বাকিপথ যেতে হবে হেঁটে। শুরু হলে দুজনের অভিযান। রাস্তার দু-পাশে ফলদায়ী বৃক্ষ আম কাঁঠালে গাছ। গাছে গাছে ফলের সমাহার। দু-জনে হাঁটছি পথ যেন শেষ হয় না। অবশেষে পৌঁছালাম সাহিত্যিক মনোজিৎকুমার দাসের বাড়ি। বড় বড় আম কাঁঠাল গাছে ঘেরা আটপৌরে বাড়ি। নিভৃতচারী বুঝি এনাদেরকেই বলে। এ সাহিত্যিক পেশায় ছিলেন স্কুল শিক্ষক। নবোদয় মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক এখন অবসর যাপন করছেন এবং আছেন পুরোপুরি সাহিত্যের সাথে। স্ব-স্ত্রীক থাকেন এখানে। একমাত্র পুত্র পরিবার নিয়ে থাকেন নড়াইলে নিজ কর্মস্থলে। ঈদের ছুটিতে থাকায় সাক্ষাৎ হয়ে গেল তাঁর পুত্রের সাথেও।
শুরু হলো আড্ডা। মনোজিৎকুমার দাসের লেখক হয়ে উঠার গল্প। লেখক হওয়ার সংগ্রাম। প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি'র খতিয়ান নিয়ে অনেক আলাপ চললো। আড্ডার মধ্যে এলো লেখকের নিজের গাছের মিষ্টি সুস্বাদু আম, বিস্কিট, চানাচুরের নাস্তা এবং রঙ চা। আড্ডা আর নাস্তা চলছে সমান তালে। কত গল্প! যেন ইতিহাস পাঠ চলছে। মনোজিৎকুমার দাস লিখেছেন কবিতা, গল্প, মুক্তিযুদ্ধের গল্প, অনুবাদ করেছেন অনেক বিখ্যাত গ্রন্থ। সর্বশেষ গত মেলায় প্রকাশিত হয়েছে 'আফ্রিকার গল্প'। আড্ডা শেষ এবার ফিরবার পালা। দেখি ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজানো! ভর্তা, ভাজি আর নদীর ছোট মাছের চচ্চড়ি তরকারি সহযোগে চমৎকার মধ্যাহ্ন ভোজন এবং শেষ পাতে ঘরে তৈরী মিষ্টির স্বাদ ভুলবার নয়। এতো সব আয়োজনের কারিগর লেখকের পুত্রবধূ।
লেখকের পুত্র আমাদের এগিয়ে দিলেন লাঙ্গবাঁধ বাজার অবধি। বাজার দর্শন শেষে ছুটলাম গৌরী দর্শনে। গড়াই নদীর অপর নাম গৌরী। বঙ্গবন্ধু ও গড়াই তথা গৌরী নিয়ে একটি বিখ্যাত কবিতা আছে কবি অন্নদা শংকর রায়ের।
যতদিন রবে
পদ্মা-মেঘনা-গৌরী-যমুনা বহমান
ততদিন রবে কীর্তি তোমার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
পড়ন্ত বিকাল। আজ হাটবার। নৌকাযোগে শতশত মানুষ সওদা পাতি করে ঘরে ফিরছে। কেউ কেউ আসছে সওদা পাতি করতে। একটি সাধু গৌষ্ঠীকে দেখলাম একটি নৌকায়। একই সাথে নৌকায় দাঁড়িয়ে আছে পাশাপাশি টিকিওয়ালা সাধু আর দাড়িওয়ালা হুজুর। অসাধারণ একটি দৃশ্য। পারের খেয়ায় কোন জাত থাকে না। উজানে পানি হওয়ায় নদীর পানিও বেশ বেড়েছে। নতুন জাগা চরগুলো ডুবে গেছে জলের তলে। খেয়াঘাটে আসলে দুটি জিনিস আমার মাথায় সব সময় ভর এক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সোনারতরী কবিতা অন্যটি হলো আমাদের জীবন! পৃথিবীতে জন্মেছি, দু দিন পরে চলে যাব। ঠিক যেন খেয়া নৌকার সওয়ারির মতো তবু আমাদের এতো বড়াই! নৌকা থেকে নামলে যেমন সওয়ারি নৌকার কাছে অপরিচিত আমি আপনিও তো তাই। মারা গেলে সবই অতীত। কেউ মনে রাখবে না তবু অযথা বাহাদুরি করি হররোজ!
অতঃপর সুর্য মামা ডুবি ডুবি করছে আর চাঁদ মামা আসি আসি করছে। এবার আমাদের ফিরবার পালা। একই দিনে নদী আর সমুদ্র ( জ্ঞানের) দেখে এবার পথ ধরলাম বাড়ির দিকে।
মনোজিৎকুমার দাসেরা নিভৃতে চুপচাপ কাজ করে যাচ্ছেন। আমাদের সাহিত্যকে ঋদ্ধ করছেন কিন্তু আমরা ক'জন রাখি তাঁদের খোঁজ? আমাদের দায়বদ্ধতা থেকেই এই সব জ্ঞানের আধারগুলোকে সামনে আনা উচিত।
লেখক: বায়েজিদ চাষা,কবি ও কথাসাহিত্যিক
[caption id="attachment_896" align="alignright" width="300"]
ছবি: বায়েজিদ চাষা, মনোজিৎকুমার দাস ও বঙ্গ রাখাল[/caption]
প্রধান সম্পাদক : নূরুল ইসলাম
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় :
আল-ফাহাদ কম্পিউটার ও গ্রাফিক্স ডিজাইন হাউস, আফরোজগঞ্জ-৩২০৩, শেরপুর, মৌলভীবাজার।
ফোন: +৮৮ ০১৭২৮-২৪২৭৮৮, ই-মেইল: creativenewsbd2019@gmail.com