ক্রিয়েটিভ নিউজ২৪ ডেস্ক:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণের আর মাত্র চার দিন বাকি। সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই নানান রাজনৈতিক সমীকরণে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে হবিগঞ্জ জেলার চারটি সংসদীয় আসনের নির্বাচনী মাঠ। ভিআইপি প্রার্থীদের উপস্থিতি, বিদ্রোহী প্রার্থীর প্রভাব, ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সক্রিয়তা এবং নতুন ভোটারদের অংশগ্রহণ- সব মিলিয়ে জেলার চার আসনেই ভোটের ফলাফল নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র অনিশ্চয়তা।
এবারের নির্বাচনে হবিগঞ্জ জেলার চারটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ২৪ জন প্রার্থী। এর মধ্যে ২০ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনীত এবং চারজন স্বতন্ত্র প্রার্থী। স্বতন্ত্রদের মধ্যে দুজন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় দলীয় ভোট বিভাজনের আশঙ্কা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিদ্রোহী প্রার্থীরাই শেষ পর্যন্ত জয়-পরাজয়ের সমীকরণ বদলে দিতে পারেন।
এ দিকে এবারের নির্বাচনে জেলার বড় একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বিপুলসংখ্যক নতুন ভোটার। মোট ১৮ লাখ ৩৩ হাজার ৯৬২ জন ভোটারের মধ্যে নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছেন ১ লাখ ৩২ হাজার ২১৭ জন। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে ‘জুলাই চেতনা’ এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা প্রবলভাবে কাজ করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ফলে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত ইমেজ, রাজনৈতিক অতীত এবং দলীয় অবস্থান- সবকিছুই ভোটের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখছে।
অপরদিকে হবিগঞ্জ-১: বিএনপির ভেতর দ্বন্দ্বেই ঘুরপাক। নবীগঞ্জ-বাহুবল আসনে বিএনপি প্রার্থী ড. রেজা কিবরিয়া ও দলের বিদ্রোহী প্রার্থী শেখ সুজাত মিয়ার মধ্যকার দ্বন্দ্বই মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। রেজা কিবরিয়া সাবেক মন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার সন্তান হওয়ায় আওয়ামী ঘরানার ভোট ব্যাংকেও তার একটি গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। অন্যদিকে শেখ সুজাত মিয়া বিএনপির পুরনো পরীক্ষিত নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য হওয়ায় নিজস্ব শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। এই দ্বন্দ্বে সুবিধা নিতে পারে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মাওলানা সিরাজুল ইসলাম মিরপুরী, যিনি ইসলামী বক্তা হিসেবে এলাকায় পরিচিত মুখ।
আরেকদিকে হবিগঞ্জ-২: বড় হুজুর বনাম জীবন। বানিয়াচং-আজমিরীগঞ্জ আসনে বিএনপি প্রার্থী ডা. আবু মনসুর সাখাওয়াত হাসান জীবন এগিয়ে থাকলেও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে আছেন খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ (বড় হুজুর)। শেষদিকে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের সক্রিয় প্রচারণা বড় হুজুরের অবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছে। ফলে এই আসনে ভোটের ফলাফল নিয়ে রয়েছে ব্যাপক কৌতূহল।
আর হবিগঞ্জ-৩: ত্রিমুখী লড়াইয়ে সমীকরণ জটিল। হবিগঞ্জ সদর-লাখাই-শায়েস্তাগঞ্জ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা জি কে গউছের বিপরীতে জামায়াতের কাজী মহসিন আহমেদ এবং ইসলামী আন্দোলনের মহিব উদ্দিন আহমেদ সোহেল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। তবে সাবেক বিএনপি নেতা এডভোকেট আশরাফুল বারী নোমানের জামায়াতে যোগদান নির্বাচনী মাঠকে নতুন করে জটিল করে তুলেছে। তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক শক্তি কাজী মহসিনের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
তবে হবিগঞ্জ-৪: চা শ্রমিকই নির্ধারণ করবে ফল। চুনারুঘাট-মাধবপুর আসনে ২৪টি চা বাগানের ভোটই মূল নিয়ামক। এখানে বিএনপি প্রার্থী এস এম ফয়সল এবং খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদেরের মধ্যেই মূল লড়াই হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শিল্পপতি ফয়সলের ব্যক্তিগত ইমেজ যেমন শক্তিশালী, তেমনি শিক্ষাবিদ হিসেবে কাদেরের গ্রহণযোগ্যতা তরুণ ভোটারদের কাছে উল্লেখযোগ্য।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- ৬৪৭ কেন্দ্রে নিরাপত্তা, ১০৩টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও এবার বড় উদ্বেগের বিষয়। জেলার মোট ৬৪৭টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১০৩টিকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ২৩২টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে প্রশাসন। হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার মোছা. ইয়াছমিন খাতুন জানান, পূর্ববর্তী নির্বাচনের সহিংসতার ইতিহাস ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ, আনসার, সেনাবাহিনী, বিজিবি এবং কুইক রেসপন্স টিম মোতায়েন থাকবে। এবার প্রথমবারের মতো প্রিসাইডিং অফিসারদের নিরাপত্তায় সশস্ত্র আনসার এবং ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা ও পুলিশের বডি ক্যামেরা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সর্বশেষ কথা- ভিআইপি প্রার্থী, বিদ্রোহী প্রভাব, ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সক্রিয়তা, নতুন ভোটারদের উপস্থিতি এবং কঠোর নিরাপত্তা- সব মিলিয়ে হবিগঞ্জের চারটি আসনের নির্বাচনী মাঠ শেষ মুহূর্তে এসে রীতিমতো রুদ্ধশ্বাস অবস্থায় পৌঁছেছে। অতীতের রাজনৈতিক ইতিহাস ও বর্তমান বাস্তবতা মিলিয়ে এবারের নির্বাচন শুধু ফলাফলের নয়, বরং রাজনৈতিক বার্তার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ক্রিয়েটিভ নিউজ২৪/ফাহাদ
প্রধান সম্পাদক : নূরুল ইসলাম
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় :
আল-ফাহাদ কম্পিউটার ও গ্রাফিক্স ডিজাইন হাউস, আফরোজগঞ্জ-৩২০৩, শেরপুর, মৌলভীবাজার।
ফোন: +৮৮ ০১৭২৮-২৪২৭৮৮, ই-মেইল: creativenewsbd2019@gmail.com