

ক্রিয়েটিভ নিউজ২৪ ডেস্ক: এক সময় শীত এলেই মৌলভীবাজারের সংরক্ষিত বাইক্কা বিল হয়ে উঠত পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আশ্রয়। ঝাঁকে ঝাঁকে বালিহাঁস, ভুতিহাঁস, পানকৌড়ি আর বাটানের ডানার শব্দে মুখর থাকত পুরো হাওর। পাখির কিচিরমিচিরে ভোর শুরু হতো, আর সেই দৃশ্য দেখতে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকত। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই পরিচিত চিত্র আজ অনেকটাই হারিয়ে গেছে। বাইক্কা বিলে এখন আর আগের মতো পরিযায়ী পাখি আসে না। পাখির খোঁজে আসা পর্যটকরাও হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
পরিবেশবাদী ও গবেষকদের মতে, জলজ উদ্ভিদ কমে যাওয়া, আবাসস্থলের ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন এবং নির্বিচারে শিকার-সব মিলিয়েই বাইক্কা বিল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে পরিযায়ী পাখি।
মৌলভীবাজার সদর, শ্রীমঙ্গল উপজেলা এবং হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার বিস্তৃত অংশ নিয়ে গড়ে ওঠা হাইল হাওরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাইক্কা বিল। এই বিলের নাম শুনলেই একসময় পাখির রঙিন সমাহারের ছবি চোখে ভাসত স্থানীয়দের। বর্তমানে পরিযায়ী পাখি প্রায় অনুপস্থিত হলেও কিছু দেশি প্রজাতির পাখি টিকে আছে-তাও সংখ্যায় খুবই কম।
পাখি গবেষকদের ভাষ্য, পাখি না আসার অন্যতম প্রধান কারণ হলো মৎস্য শিকারের জন্য বিল থেকে জলজ উদ্ভিদ তুলে ফেলা। কচুরিপানা, শাপলা-শালুক না থাকায় পাখিদের বসে খাবার খাওয়ার জায়গা নেই। পাশাপাশি হাওরে গাছগাছালি কমে যাওয়া, অপরিকল্পিত ভরাট, সেচ ও বিষ প্রয়োগ করে মাছ নিধন, হাওরের ভেতর দিয়ে যানবাহন চলাচল এবং নিষিদ্ধভাবে পাখি শিকার-সবকিছুই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
উল্লেখ্য, ২০০৩ সালের ১ জুলাই জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ১০০ হেক্টর জলাভূমিকে ‘বাইক্কা বিল অভয়াশ্রম’ ঘোষণা করে ভূমি মন্ত্রণালয়। তখন মাছ ধরা ও জলজ উদ্ভিদ আহরণ নিষিদ্ধ করা হয়। তবে বাস্তবে পাখি শিকার বন্ধ করা যায়নি। জলজ উদ্ভিদ ধ্বংসের ফলে একসময় যে বিলে বালিহাঁস, গিরিয়া হাঁস, পানকৌড়ি, বাটান, শামুকখোল, শকুন, বকসহ অসংখ্য প্রজাতির পাখির সমাগম ছিল- আজ সেখানে বেশিরভাগই আর দেখা যায় না। এখন মূলত বিলপাড়ের গাছে শালিক, দোয়েল, ঘুঘু, চড়ুই, বুলবুলির মতো কিছু দেশি পাখিই চোখে পড়ে।
গণমাধ্যমকে পরিবেশকর্মী আহাদ মিয়া বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে বাইক্কা বিলে পরিযায়ী পাখি কমে যাওয়ার মূল কারণ জলজ ও স্থলজ পরিবেশের অবক্ষয়। কিছু মানুষের অসচেতন কর্মকাণ্ড জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর ফল আমরা ধীরে ধীরে দেখতে পাচ্ছি। এখনই উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।’
বাইক্কা বিলের দায়িত্বে থাকা বড়গাঙ্গিনা সম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মিন্নত আলী জানান, ‘আগে পাখির সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। এখন কচুরিপানা, শাপলা-শালুক না থাকায় পাখি কমে যাচ্ছে। নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল দিয়ে পাখি শিকার এবং সেচ মেশিন ব্যবহারও বড় কারণ। তবে এখনও পুরো শীত শেষ হয়নি, এবছর পাখি আসার কিছুটা সময় আছে।’
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম বলেন, ‘হাওরের গভীরতা আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। যেখানে আগে সারা বছর পানি থাকত, এখন সেখানে কয়েক মাসেই পানি শুকিয়ে যায়। মানুষের অবাধ চলাচলও বেড়েছে। এসব কারণেই পরিযায়ী পাখি আগের মতো আসছে না।’
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে বাইক্কা বিল তার পরিচিতি হারাবে পুরোপুরি। পরিযায়ী পাখি ফিরিয়ে আনতে হলে জলজ উদ্ভিদ সংরক্ষণ, শিকার বন্ধ, হাওরের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা এবং কঠোর নজরদারির বিকল্প নেই। নইলে একসময় যে হাওর ছিল পাখির স্বর্গ, তা কেবল স্মৃতির পাতায়ই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে।
#ক্রিয়েটিভ নিউজ২৪/ফাহাদ
