• ঢাকা
  •    রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০২:২৭ এএম


পর্যটকের চোখ কাউয়াদীঘির সৌন্দর্যে, জলের গ্রাম অন্তেহরি জলজটে

আপডেট টাইম: August 22, 2026 12:14 pm




নূরুল ইসলাম ও ফাহাদ আহমদ: 

কাউয়াদীঘি হাওরপারের গ্রাম অন্তেহরি। খানিক দূর থেকে দেখলে গ্রামটিকে পানিতে ভাসমান সবুজেঘেরা দ্বীপ মনে হয়। বর্ষায় নৌকা কিংবা সাঁকো ছাড়া এ বাড়ি ওবাড়ি বাড়িতে যাতায়াত করা দুঃসাধ্য। এমন ঝুঁকিপূর্ণ দুর্ভোগ মাড়িয়ে ছোট সোনামণি শিক্ষার্থীরা স্কুলে যাতায়াত করছে। বৃষ্টি-বাদল মৌসুম এলেই এমন প্রতিকুল পরিস্থিতির মুখোমুখি জলের গ্রামখ্যাত অন্তেহরির মানুষ।


চারিদিকে থৈ থৈ জলরাশি। মাঝখানে কোথাও ইট বাঁধাই, কোথাও কাঁচা রাস্তা। রাস্তার পাশে লম্বাগলিতে অন্তেহরি বাজার। রাস্তাটি মাঝখান দিয়ে বহে যাওয়ায় গ্রামটি ভাগ হয়ে গেছে। বর্ষায় এ বাজারটি যেন অন্তেহরি ও কাদিপুর গ্রামের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মিলনমেলার একটুকরো স্থল ভূমি। পাল তোলা নৌকাসহ জেলেদের ছোট-বড় হাওর জলে নিরন্তর এদিক ওদিক ছুটে চলছে। খানিক ফুসরতে অন্তেহরি বাজারে চা-সিঙারা আর বিড়ি-ছুরটের ধোঁয়া ওড়ানোর সাথে গালগপ্প তো আছেই। সকাল থেকে গভীর রাত অবধি চা স্টলগুলোতে কেনা-বেচা চলে। রবী ঠাকুরের আমাদের ছোট নদী চলে বাকেঁ বাকেঁ। একটি দু’টি নয় একশ’র বেশি নদী, বিল, খাল বিধৌত জলরাশির মিলিত প্রবহে কাউয়াদীঘি হাওরের বিশাল জলভাণ্ডার। এখানকার মাঝেরবান্ধ, শালকাটুয়াসহ বিভিন্ন হাওর, বিল, নালা, শীত-বর্ষায় দেশীয় প্রজাতির মৎস্য ভাণ্ডার হিসেবে বহুল পরিচিতি রয়েছে। বিল ইজারা থেকে প্রতি বছর কোটি কোটি রাজস্ব আয় হয়। বৈশাখ-আশ্বিন মাস পর্যন্ত মৎস্যজীবি জেলেরা হাওরের ভাসান পানিতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। শুস্ক মৌসুমে ১০-১১ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়। এ থেকে ৫০-৬০ হাজার টন ধান উৎপাদন হয়ে থাকে। এ তথ্য দিয়েছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এতে কাউয়াদীঘির পানি সম্পদের মাঝে মৎস্যের সাথে ফসল ভাণ্ডার দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

কাউয়াদীঘি হাওরপারের অন্তেহরি ও নিকটবর্তী কাদিপুর বর্ষায় জলে ডোবা গ্রাম। যোগাযোগ ব্যবস্থায় নৌকা নির্ভরতা পিছু ছাড়ছে না। কিন্তু শিক্ষা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই তারা। এ অঞ্চলে দু’টি সরকারি প্রাথমিক ও একটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে।


অন্তেহরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শর্মী দাশ, প্রান্ত চক্রবর্তী, চয়নিকাসহ আরও শিক্ষার্থীরা জানান বাড়ির বাইরে পা দিলেই পানি পানি। এমন অবস্থায় স্কুলে যাইমু কেমনে? ভাড়া কিংবা নিজেদের নৌকায় ধনী মানুষের ছেলে মেয়েরা স্কুলে যায়। গরীব ছাত্ররা ৬-৭ মাস স্কুলে যায়। বর্ষার সময় পানিবন্দি থাকে।

ওই গ্রামের অভিভাবক লিটন দাশ জানান জলের গ্রাম নামে পরিচিত অন্তেহরি গ্রাম ও কাউয়াদীঘি হাওরের সৌন্দর্য অবলোকনে প্রতিদিন শতশত পর্যটক যাতায়াত করে থাকেন। প্রত্যন্ত হাওরপারের একটি গ্রাম পর্যটনের খ্যাতি অর্জন অবশ্যই সুনামের। এই সুখ্যাতি ধরে রাখার জন্য প্রয়োজন যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন। তিনি আরও জানান পাড়ায় বর্ষার দিন-রাত, শীতে রাতে রাধা রমণ, শাহ আব্দুল করিম, লালন শাসহ অনেক বাউল ও লোকগীতির আসর জমে। প্রাকৃতিক ভাবে শৈল্পিক গুণে বেড়ে ওঠা শিল্পমনা শিশু-কিশোরদের শিল্প বিকাশে একটি সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র সরকারি অর্থায়নে গড়ে স্থাপনের দাবি জানান তিনি।


কাদিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা রাখী রানী দাশ জানান বিদ্যালয়ের চারি দিকে থইথই পানি। খাল-নালা কচুরিপানায় ভরা। নৌকা ছাড়া বর্ষার ৩-৪ মাস শিক্ষার্থীরা স্কুলে যাতায়াতে নৌকার বিকল্প নাই। যাদের নৌকা নাই তারা স্কুলে আসতে পারে না। শিশু শ্রেণির ছাত্ররা তো এ সময়ে স্কুলে আসা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি জানান এখন অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা চলছে। তাই বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের সাথে কথা বলে এবং দপ্তরীকে কাজে লাগিয়ে পরীক্ষাকালীন বিদ্যালয়ের ১১৪ শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। অন্তেহরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা নীলিমা দাশ জানান অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর দুই মাস আগে বৃষ্টি বাদল শুরু হওয়ায় জলের গ্রাম নামে পরিচিত অন্তেহরি বসন্তেই জলমগ্ন হতে শুরু করে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার দুই মাসের বেশি সময় জল-কাদার সাথে যুদ্ধ করে পাঠদান কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। তাছাড়া স্কুল ঘরের লাগোয়া পানির লেভেল। নৌকা ছাড়া চলাচল প্রায় অসম্ভব। দু’টি শ্রেণি কক্ষে পার্টিশন দিয়ে ৪টি কক্ষ বানিয়ে ৬ ক্লাসের পাঠদান চালানো হচ্ছে। পরীক্ষার সময়ে চারিদিকে পানি থাকার পর বিদ্যালয়ের ১২১ শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি জানান বর্ষায় শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ৪-৫টি নৌকার ব্যবস্থা করা হলে সহজে ছাত্র-ছাত্রীরা আসা যাওয়া করতে পারত।

মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. মিজানুর রহমান মিজান ক্রিয়েটিভ নিউজ২৪ – কে বলেন পানিবন্দী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আবেদন করলে তাদের নিরাপদ যাতায়াতের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।