

মোঃ ফাহাদ আহমদ, নিজস্ব প্রতিবেদক: পৌষসংক্রান্তি এলেই মৌলভীবাজারের মানুষের মনে ফিরে আসে এক চিরচেনা দৃশ্য- কুশিয়ারা নদীর তীরে বসা শেরপুরের মাছের মেলা। শতবর্ষী এই মেলা এখন আর কেবল কেনাবেচার স্থান নয়; এটি মৌলভীবাজারের মানুষের আবেগ, ঐতিহ্য ও উৎসবের অংশ। অন্যসব হাটবাজার যেখানে সারা বছর ধরে চলে, সেখানে শেরপুরের মাছের মেলা বছরে মাত্র একবার- পৌষসংক্রান্তিকে ঘিরেই বসে। আর এই একদিনের অপেক্ষাতেই যেন জমে থাকে পুরো বছরের গল্প।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার খলিলপুর ইউনিয়নের শেরপুর এলাকায় বসেছে প্রায় দুইশো বছরের পুরোনো এই মাছের মেলা। প্রতিবছরের মতো এবারও মেলায় উঠেছে নানা জাতের বাহারি মাছ। আড়তদাররা সাজিয়ে রেখেছেন বড় বড় কাতল, রুই, বোয়াল, আইড়, চিতলসহ নানা প্রজাতির মাছ। শতাধিক কেজি ওজনের মাছও নজর কেড়েছে দর্শনার্থীদের।
এবছর মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) থেকে শুরু হবে মেলার আয়োজন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার (১২ জানুয়ারি) বিকেল থেকেই মেলার আমেজ ছড়িয়ে পড়ে শেরপুরজুড়ে। তবে সংক্রান্তির মূল দিনে, বুধবার (১৪ জানুয়ারি) মেলা পুরোপুরি জমে উঠবে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ী ও আয়োজকেরা।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দক্ষিণ পাশে এবং মৌলভীবাজার-শেরপুর আঞ্চলিক সড়কের পশ্চিমের মাঠে, বেরি বিল-সংলগ্ন এলাকায় বসেছে এবারের মেলা। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের হাওর-বাঁওড় ও নদ-নদীর মাছের জন্য এই মেলার আলাদা কদর রয়েছে। সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের হাকালুকি, কাউয়াদিঘি, হাইল হাওরসহ কুশিয়ারা নদীর মাছই এখানে প্রধান আকর্ষণ।
ক্রেতারা জানান, বাজারে চাষের মাছের আধিক্য থাকলেও শেরপুরের মেলায় মূলত স্থানীয় মুক্ত জলাশয়ের মাছই বেশি জনপ্রিয়। তবে এ বছর স্থানীয় মাছের জোগান তুলনামূলক কম হওয়ায় দাম কিছুটা বেশি। তবুও ঐতিহ্যের টানে মানুষ ভিড় করছেন মেলায়- দেখতে, কিনতে আর উৎসবের স্বাদ নিতে।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, পৌষসংক্রান্তি উপলক্ষে এই মাছের মেলার প্রচলন শুরু করেছিলেন জমিদার মথুর বাবু। প্রথমদিকে মেলাটি সদর উপজেলার মনুমুখ এলাকায় বসত। পরবর্তীতে এটি স্থানান্তরিত হয় শেরপুরে, কুশিয়ারা নদীর তীরে। সময়ের পরিক্রমায় স্থান বদলালেও মেলার আবেদন ও ঐতিহ্য আজও অটুট।
মৎস্যজীবীদের কাছে এই মেলা বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। তারা জানান, মেলায় বড় মাছ বিক্রির জন্য ৫ থেকে ৬ মাস আগেই প্রস্তুতি শুরু করেন। বিভিন্ন হাওর ও নদী থেকে সংগ্রহ করা বড় মাছ বিশেষ ব্যবস্থায় পানিতে বাঁচিয়ে রাখা হয়, যেন সংক্রান্তির দিনে ক্রেতাদের কাছে তাজা মাছ তুলে দেওয়া যায়।
শেরপুরের মাছের মেলা তাই শুধু একটি বাণিজ্যিক আয়োজন নয়; এটি মৌলভীবাজারের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত ঐতিহ্য। পৌষসংক্রান্তির সঙ্গে একই সুতোয় গাঁথা এই মেলা আজও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলেছে নদীর স্রোতের মতোই অবিরাম।
