

নিউজ ডেস্ক:
একটি নদী খননে খরচ হয়েছে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। খনন হয়েছে সাড়ে আট কিলোমিটার অংশ। কিন্তু ছয় বছর পরও সেই নদীই যেন মরে পড়ে আছে। বরাক নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ থাকায় সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি জমছে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার খলিলপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকায়। এ বছরও প্রায় ৫০০ বিঘা বা তার বেশি জমির রোপা আমন পানিতে তলিয়ে নষ্ট হয়েছে বলে স্থানীয় কৃষকদের দাবি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নদী খনন হলেও দখলদার উচ্ছেদ করা হয়নি। সবচেয়ে বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার গোপলার বাজার এলাকায়। সেখানে নদীর মুখে ঘরবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে ওঠায় পানি নিষ্কাশনের পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে এক উপজেলার পানি অন্য উপজেলার সীমান্তে এসে আটকে থাকছে। আর দুই উপজেলার প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাবে ছয় বছর ধরে ঝুলে আছে স্থায়ী সমাধান।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২০ সালে বরাক নদীর প্রায় সাড়ে আট কিলোমিটার অংশ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে ব্যয় হয় প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। তবে খননকাজের পরও নদীর পানি প্রবাহ স্বাভাবিক হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীতীরের অবৈধ দখল উচ্ছেদ না করেই অনেক স্থানে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ ফুট প্রশস্ত করে খনন করা হয়। এতে নদীর মূল প্রবাহপথ উন্মুক্ত হয়নি। বর্ষায় উজান থেকে পানি নামলেও তা দ্রুত বের হতে পারে না।
খলিলপুর ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, নদীটি এখন অনেকটা মরা খালের মতো। কোথাও পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট, কোথাও দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।
বরাক নদীর পানি নিষ্কাশনের গুরুত্বপূর্ণ অংশটি পড়েছে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার গোপলার বাজার এলাকায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, ওই এলাকায় নদীর ওপর ও দুই তীরে একাধিক স্থাপনা গড়ে ওঠায় পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এর প্রভাব পড়ছে মৌলভীবাজারের খলিলপুর ইউনিয়নে। চানপুর, আলাপুর, কাটারাই, খঞ্জনপুর, সাটিয়া, লামুয়া, বাদে ফতেপুর ও কেশবচরসহ কয়েকটি গ্রামের পানি সময়মতো নামতে পারছে না। ফলে বর্ষা এলেই এসব এলাকায় জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। কখনো কখনো বসতবাড়িতেও পানি ঢুকে পড়ে। স্থানীয়দের কেউ কেউ আশ্রয়কেন্দ্র বা আশ্রমে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
স্থানীয়দের দাবি, ২০২০ সালের খননকাজের পর থেকেই নদীর দখলমুক্তকরণ ও পুনর্খননের দাবি উঠছে। কিন্তু নদীর একটি অংশ দুই জেলার দুই উপজেলার প্রশাসনিক সীমার মধ্যে পড়ায় বিষয়টি জটিল হয়ে পড়ে।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, তৎকালীন মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য নেছার আহমদ এবং নবীগঞ্জ-বাহুবল আসনের সংসদ সদস্য গাজী মোহাম্মদ শাহনওয়াজ (মিলাদ গাজী) এর সময়েও বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার আলোচনা ও বৈঠক হয়েছিল। কিন্তু নদীর দখল উচ্ছেদ ও খনন নিয়ে কার্যকর সমন্বয় হয়নি। ফলে নদী রয়ে গেছে আগের অবস্থাতেই, আর প্রতিবছর জলাবদ্ধতার খেসারত দিচ্ছেন কৃষকেরা।
চলতি মৌসুমে টানা বৃষ্টির পর খলিলপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে ব্যাপক জলাবদ্ধতা। স্থানীয় কৃষকদের হিসাবে, প্রায় ৫০০ বিঘা বা তারও বেশি জমির রোপা আমন ধান পানির নিচে তলিয়ে নষ্ট হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠে পানি জমে আছে। কোথাও ধানের চারা পানির নিচে, কোথাও পচে যাওয়া ধানের গাছ পড়ে আছে। পানি নামতে না পারায় অনেক জমিই এখন চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
কৃষক ছানু মিয়া বলেন, “প্রতিবছর ফসল হারিয়ে আমরা নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছি। আমরা ত্রাণ বা শুকনো খাবার চাই না। বরাক নদী পুনর্খনন, অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ ও জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান চাই।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রতিবছর জলাবদ্ধতা বা বন্যার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ ও শুকনো খাবার দেওয়া হয়। কিন্তু এতে সাময়িক দুর্ভোগ কমলেও সমস্যার মূল কারণ থেকে যায়। তাঁদের প্রশ্ন, একবার নদী খননে কোটি টাকা ব্যয় হওয়ার পরও কেন ছয় বছর ধরে একই দুর্ভোগ? নদীর মুখ বন্ধ থাকলে শুধু এক অংশ খনন করে কীভাবে পানি নিষ্কাশন স্বাভাবিক হবে?
এব্যাপারে মৌলভীবাজার সদর উপজেলা উপসহকারী প্রকৌশলী (সেচ) মোহাম্মদ জাকির হোসাইন বলেন, সেটা তো অনেক বড় সমস্যা, আমি নিজে গিয়ে দেখেছি, তবে এটা আমাদের কাজ না, আপনি পানি উন্নয়ন বোর্ড এর সাথে যোগাযোগ করেন।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাজিব হোসেন বলেন, এ বিষয়ে আপনি (বিএডিসি) অফিসারের সাথে কথা বলেন উনি আপনাকে বিস্তারিত বলবেন।
