• ঢাকা
  •    সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৪৭ পিএম


নবীগঞ্জে আইনশৃঙ্খলার টানাপোড়েন: টর্চলাইট থেকে রক্তপাত, নাকি সমাজের গভীর সংকেত?

আপডেট টাইম: October 19, 2025 11:34 am



দুর্ঘটনা, সংঘর্ষ, শিশুমৃত্যু আর পুলিশের ওপর হামলা-  ২০২৫ সালে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ যেন উন্নয়ন আর অনিশ্চয়তার এক দ্বন্দ্বে আটকে গেছে।

২০২৫ সাল নবীগঞ্জের জন্য কেবল সময়ের হিসাব নয়-  এটি যেন সমাজের চরিত্র মাপার বছর। একদিকে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড, অন্যদিকে সংঘর্ষ, শিশুমৃত্যু ও পুলিশ আক্রান্ত হওয়ার মতো ঘটনা। নবীগঞ্জে আইনশৃঙ্খলার এই টানাপোড়েন কি কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতা, নাকি এক গভীর সামাজিক সংকেত?

১ এপ্রিল নবীগঞ্জ পৌরসভার গন্ধা এলাকায় সিএনজি অটোরিকশার চাপায় প্রাণ হারায় চার বছরের শিশু মরিয়ম বেগম। এর দুই সপ্তাহ পর, ১৬ এপ্রিল দীঘলবাক ইউনিয়নে বজ্রাঘাতে মারা যান যুবক আবদুল হান্নান (২১)।
এই দুই মর্মান্তিক ঘটনাই যেন বছরের প্রথম সতর্ক ঘণ্টা বাজায়।

৭ জুলাই স্থানীয় দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত হন এক ব্যক্তি, আহত হন শতাধিক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রশাসন বাধ্য হয় ১৪৪ ধারা জারি করতে- যা বহু বছর পর নবীগঞ্জে প্রয়োগ হয়। এ ঘটনা নবীগঞ্জবাসীর মাঝে নতুন করে ভয় ও অবিশ্বাস তৈরি করে।

২ সেপ্টেম্বর দিঘলবাক ইউনিয়নের রাধাপুর সড়কে গ্রাম-বিরোধে নিহত হন সাব্বির হোসেন (২৭)। মাত্র এক সপ্তাহ পর ১০ সেপ্টেম্বর পুকুরে ডুবে মারা যায় তিন শিশ- রাব্বী, রায়হান ও নূর। এই শিশুদের মৃত্যু যেন পুরো উপজেলাকে স্তব্ধ করে দেয়।

অক্টোবরের শুরুতেই ঘটে ভয়াবহ এক ঘটনা- পুলিশকে পিটিয়ে আসামি ছিনিয়ে নেওয়া। আহত হন অন্তত ছয়জন পুলিশ সদস্য। আইনের রক্ষকদের ওপর এমন আক্রমণ নবীগঞ্জে প্রশাসনের প্রতি আস্থা ও ভয় উভয়ই নড়বড়ে করে দেয়।

১৮ অক্টোবর রাত ৭টায় উপজেলার সন্দলপুর ও কালিয়ারভাঙ্গা গ্রামের মাঝখানে এক মিষ্টির দোকানে ওজন কম দেওয়া নিয়ে শুরু হয় বাকবিতণ্ডা। এক পর্যায়ে টর্চলাইট জ্বালিয়ে যাচাই করতে গেলে মুহূর্তেই লাঠি- দা- রডের সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে দুই গ্রামের শতাধিক মানুষ।
আহত হয় অন্তত ৫০ জন।

জানা যায়, সংঘর্ষের ভয়াবহতা এমন ছিল যে অতিরিক্ত পুলিশ পাঠাতে হয়। একটি মিষ্টির দোকানের ওজন নিয়ে শতাধিক মানুষের আহত হওয়া- এটি নিঃসন্দেহে সামাজিক সহনশীলতার ভয়াবহ পতনের প্রতীক। এছাড়াও উপজেলাজুড়ে চোখে পড়ার মতো আরও অসংখ্য ঘটনাবলী রয়েছে।

এই ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়- বরং একটি ধারাবাহিক সামাজিক অবক্ষয়ের ইঙ্গিত। আইন প্রয়োগ যতই জোরালো হোক না কেন, নাগরিক মানসিকতা যদি দায়িত্বশীল না হয়, তবে শৃঙ্খলা ফিরবে না।

নবীগঞ্জে স্থানীয় নেতৃত্বের বিভাজন, রাজনৈতিক প্রভাব, এবং সাধারণ মানুষের নীরবতা মিলে প্রশাসনিক উদ্যোগকে দুর্বল করে তুলছে। নেতৃত্ব যখন জনগণের আস্থা হারায়, তখন সমাজে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাও হারিয়ে যায়।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে নবীগঞ্জে ইতিবাচক উদ্যোগ চলছে-
জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহ উদযাপন, টাইফয়েড ভ্যাকসিন ক্যাম্পেইন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন- এসবই আশাব্যঞ্জক দিক। কিন্তু একই সময়ে সংঘর্ষ, মৃত্যুর মিছিল ও পুলিশ আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা- সমাজে ভয়াবহ বৈপরীত্য তৈরি করছে। এ যেন উন্নয়নের মঞ্চে অস্থিরতার ছায়া।

শেষ কথা- ২০২৫ সালের নবীগঞ্জ আমাদের শেখায়-
আইনশৃঙ্খলা কেবল পুলিশের নয়, পুরো সমাজের দায়বদ্ধতার প্রতিফলন। যেখানে শিশুরা রক্ষা পায় না, যেখানে প্রশাসন আক্রান্ত হয়, সেখানে উন্নয়নের গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

নবীগঞ্জ আজ এক আয়না- যেখানে আমরা দেখতে পাই আমাদের সমাজ কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। যদি এখনই নাগরিক সচেতনতা, নেতৃত্বের জবাবদিহি, ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা না ফিরে আসে, তবে এই ভাঙন একদিন ভয়াবহ রূপ নেবে- যার অভিঘাত কেবল নবীগঞ্জে নয়, পুরো বাংলাদেশে পড়বে।