• ঢাকা
  •    সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:০৯ পিএম


কবি আকছারুল ইসলাম : একজন বয়সী বটবৃক্ষ

আপডেট টাইম: September 29, 2024 3:30 pm



  1. বটবৃক্ষের ছায়া শীতল হয় শ্রান্ত পথিক, ক্ষুধা নিবৃত্ত করে পাখি, অক্সিজেনে বাঁচে বিভিন্ন জীব। বিনিময়ে কিছুই পায় না সে। তবু থামে না তার নিঃস্বার্থ নিবেদন। তাই বটবৃক্ষের প্রতি আমার দুর্বলতা আছে ভীষণ। মানুষের মধ্যেও এমন বটবৃক্ষ সম মানুষ আছেন যারা নিজেকে বিলিয়ে দেন অন্যের তরে। বিনিময়ে প্রাপ্তির খাতা খালিই পড়ে থাকে। সেইসব বটবৃক্ষ মানুষের প্রতিও আমার দুর্বলতা আছে। তেমনি একজন প্রাচীন বটবৃক্ষ সম মানুষ হলেন কবি আকছারুল ইসলাম। বাড়ি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানাধীন শান্তিডাঙ্গা গ্রামে। উনার নামের সাথে পরিচিত হলেও সরাসরি কখনও দেখা হয়নি। কিছুদিন আগে কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক বঙ্গ রাখাল জানালেন কবি আকছারুল ইসলাম কাকা অসুস্থ তাঁকে একটু দেখতে যাওয়া দরকার। কিন্তু সময় বের করতে পারছিলাম না আমরা।

ঈদের পঞ্চম দিন। সকাল দশটা নাগাদ বঙ্গ রাখালের মেসেজ পেলাম। ‘ কাজ শেষ করে বের হন আকছারুল কাকাকে দেখতে যাবো। উনার শরীরটা খুব বেশি ভালো না।’
সব কাজ গুছিয়ে দুপুর দেড়’টা নাগাদ পৌঁছালাম চড়িয়ারবিল বাজারে। এখান থেকেই বঙ্গ রাখালের সঙ্গী হয়ে শান্তিডাঙ্গা যাবো। একটু চা-টা খাওয়ার জন্য দোকানে বসতেই ঝুপঝাপ বৃষ্টি শুরু হলো। প্রচন্ড গরমের পর বৃষ্টি একটু শীতলতার পরশ ছোঁয়াচ্ছিল। আমরা চা পান করছি, বাইরে বৃষ্টি ঝরছে, মন উসখুস করছে কখন থামবে বৃষ্টি?
অতঃপর গুড়িগুড়ি বৃষ্টির মধ্যেই অটো বাইকে চড়ে বসলাম। শেখপাড়া গিয়ে অটো থেকে নেমে ভ্যান যোগে রওনা হলাম শান্তিডাঙ্গা। মহাসড়ক থেকে বেশ খানিকটা দূর। গ্রাম্য পথ। ভ্যান চলছে। অবশেষে চালক নামিয়ে দিলেন কবি আকছারুল ইসলামের বাড়ির সামনে। বাড়ির সামনে দিয়ে বেশ প্রশস্ত জলশূন্য খালের মত জলাধার। সম্ভবত কোন কালে নদী ছিলো এখন স্রোত হারিয়ে খাল হয়ে গেছে। লাল ইটের তৈরী একটি ছোট ঘর। দরজা জানালাগুলো লাগানোর সামর্থ্য নেই তাই টিন দিয়েই বন্ধ সেগুলো। ঘরের দেওয়ালেও প্লাস্টার করানো সম্ভব হয়নি। বাইরের দেওয়ালে টিনের ফলকে কবি সম্পর্কে দু একটি কথা লেখা আছে। ফটোকপি করা কাগজেও তার সম্পর্কে দু একটি কথা লেখা আছেও সেটিও দেওয়ালে সাঁটানো। বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা গেল বারান্দার দেওয়ালে বিভিন্ন পত্রিকার কাগজে তার সম্পর্কে যা লেখা ছেপেছে তা সাঁটানো আছে।
কবি’র সাথে পরিচয় হলো। অশীতিপর বৃদ্ধ কবি। বয়স ৯০ এর কোঠায়। বাড়ির সামনে দিয়ে বয়ে চলা নদীর মতো ( সম্ভবত নদী ছিলো) বয়স হয়েছে। কিন্তু কবি নদী নয় কবি সমুদ্র তাই তিনি স্থবির নেন। কবি প্রবাহমান স্রোতধারা। তিনি আমাদের দেখালেন বিভিন্ন লেখক গবেষক তাঁকে নিয়ে কি লিখেছেন সেসব বই ও পত্রিকা। বঙ্গ রাখাল, শফিক হাসান, সাইমন জাকারিয়া ও অন্যান্য অনেক লেখক গবেষক তাঁকে নিয়ে লিখেছেন দু চারটি কথা। সে সব দেখলাম।
কবি আকছারুল ইসলামের জন্ম ৪০ এর দশকে। আদি নিবাস ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপায় হলেও দীর্ঘদিন যাবই স্থায়ীভাবে বাস করছেন শান্তিডাঙ্গায়। পিতা ছিলেন যাত্রাশিল্পী তাই লোকসাহিত্যের সাথে তার পরিচয় ছোট থেকেই। তিনি প্রথম মুসলিম যাত্রাপালা লেখক যা তিনি ১৯৬০ সালে রচনা করেন। খেয়ালী এ সাহিত্য সাধক দশম শ্রেণী পর্যন্ত একাডেমিক শিক্ষা অর্জনের পর সবকিছু ত্যাগ করে সাহিত্য সাধনায় ব্রতী হন। পয়ত্রিশটি যাত্রাপালা সহ ১৯৪টি গ্রন্থ লিখেছেন তিনি। কিন্তু দারিদ্রতায় পিষ্ট হয়ে কোনমতে বয়ে চলা সংসারের চাপে এবং কোন প্রকাশনীর সহযোগিতা না পাওয়ায় যথাযথ ভাবে একটি বইও করতে পারেননি। শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতায় সাধারণ ভাবে মুদ্রণ করে ফটোকপির মাধ্যমে বই তৈরী করেছেন। কিছু বই পাওয়া যায় স্থানীয় লাইব্রেরিতে। তাঁর গান কবিতা সংখ্যা ত্রিশ হাজারের বেশি।
সাহিত্যের পেছনে জীবন ক্ষয় করা এই মানুষটি বিনিময় পাননি তেমন কিছুই। পাওয়ার জন্য কোন হাহাকারও নেই । নিভৃতচারী সম্ভবত এনাদেরকেই বলে। পাওয়ার মধ্যে এতটুকু তা হলো ১৯৮২ সাল থেকে দুস্থ সাহিত্যিক হিসাবে যৎসামান্য ভাতা পাচ্ছেন। তার পরিমান এতটাই কম যা বলার মতো না। অতি সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ কতৃক তাঁর কিছু গান ও কবিতা নিয়ে একটি সংকলন করার উদ্যোগ নিয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে এটিই হবে তাঁর লেখা এখন অবধি একমাত্র বিধিবদ্ধ বই! কবে এটি আলোর মুখ দেখবে জানি না।
ব্যক্তি আকছারুল ইসলাম অত্যন্ত সহজ, সরল, নিপাট, দিলখোলা মানুষ। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়লেই মানসিক ভাবে ভীষণ প্রাণবন্ত আর আড্ডা প্রিয় মানুষ। প্রায় দুই ঘন্টা যাবৎ চলা আড্ডায় কবির জীবনের নানা বাঁকের নানা গল্প শুনে মনে অন্যরকম অন্যরকম অনূভুতির সৃষ্টি হলো।
এবার ফেরার পালা। দীর্ঘ সময় বটবৃক্ষের ছায়ায় মনকে শীতল করে ফেরার পথ ধরলাম। এমন বটবৃক্ষগুলো হারিয়ে যাচ্ছে অথচ আমরা কিছুই করছি না তাঁদের জন্য। কেন একজন মহামানব বলেছেন ‘ যে দেশে জ্ঞানী মানুষের কদর করা হয় না সে দেশে জ্ঞানী মানুষের জন্ম হয় না।’ আমরা কি তবে এজন্যই ধীরে ধীরে জ্ঞানশূন্য একটি অন্ধ, মূক, বধির ও নির্বোধ জাতিতে রূপ নিচ্ছি?!

লেখক: বায়েজিদ চাষা, (কবি ও কথাসাহিত্যিক) 

কবি বঙ্গ রাখাল, কবি আকছারুল ইসলাম ও কবি বায়েজিদ চাষা