

ডেস্ক রিপোর্ট: বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ ও প্রভাবশালী অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন। একই সঙ্গে বিএনপির মিডিয়া সেল তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক শোকবার্তায় জানায়- “খালেদা জিয়া আর আমাদের মাঝে নেই। আজ সকাল ৬টায় তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।”
শেষ রাতের অবনতি, নিভে গেল আশার প্রদীপ:
সোমবার সন্ধ্যা থেকেই সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। চিকিৎসায় নিয়োজিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্য ডা. জিয়াউল হক জানান, তিনি তখন ‘ক্রিটিক্যাল’ অবস্থায় লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে।
রাত ২টার পর হাসপাতালের সামনে এসে সাংবাদিকদের অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন, খালেদা জিয়া “অত্যন্ত সঙ্কটময় সময় পার করছেন” এবং তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে দেশবাসীর কাছে দোয়ার আবেদন জানান। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে কয়েক ঘণ্টা পর চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন স্বজন ও দলের শীর্ষ নেতারা:
শেষ সময়ে হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান, প্রয়াত ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শামিলা রহমান ও তাঁর দুই কন্যা। এছাড়া পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
দীর্ঘদিনের জটিল রোগভোগ:
খালেদা জিয়া বহু বছর ধরে লিভার সিরোসিস, হৃদরোগ, কিডনি সমস্যা, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস ও শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। ২০২৪ সালের জুনে তাঁর হৃদপিণ্ডে পেসমেকার বসানো হয়। এর আগে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তাঁকে সিসিইউতে চিকিৎসা নিতে হয়েছিল।
শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় গত ২৩ নভেম্বর তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মাসের শুরুতে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও শারীরিক ঝুঁকির কারণে তা আর সম্ভব হয়নি।
কারাবাস থেকে মুক্তি, তারপর নিস্তব্ধতা:
২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় কারাদণ্ডপ্রাপ্ত খালেদা জিয়া দীর্ঘ সময় কারাগার ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরে নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষ মুক্তি পেয়ে গুলশানের বাসভবনে অবস্থান করেন। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতির আদেশে তিনি সব মামলা ও দণ্ড থেকে পূর্ণ মুক্তি পান।
‘আপসহীন নেত্রী’ থেকে ইতিহাসের পাতায়:
১৯৪৫ সালে জলপাইগুড়িতে জন্ম নেওয়া খালেদা জিয়া রাজনীতিতে আসেন স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যার পর। নেতৃত্ব সংকটে থাকা বিএনপির হাল ধরেই তিনি হয়ে ওঠেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রধান মুখ। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা তাঁকে পরিচিত করে তোলে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে।
তিনবার প্রধানমন্ত্রী থাকা এই নারী নেত্রী বাংলাদেশের রাজনীতিতে রেখে গেছেন তীব্র বিতর্ক, সংগ্রাম ও নেতৃত্বের এক অনন্য ইতিহাস।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আজ তাই শোকের ছায়া- নীরবে ঝরে পড়ল আরেকটি অধ্যায়।
#ক্রিয়েটিভ নিউজ২৪/ফাহাদ
